ব্রেকিং নিউজ নজরুলের সাম্য ও মানবতার চেতনায় সমাজ গড়ার আহ্বান : কালীগঞ্জে এমপি ফজলুল হক মিলনেরগাজীপুরে তুচ্ছ ঘটনায় বসতঘরে হামলা, আহত ৪কয়রায় সিএসও নেটওয়ার্কের প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিতআত্রাইয়ে চুরি-ডাকাতিসহ পাঁচ মামলার আসামি গ্রেফতারদুপচাঁচিয়া সদর ইউনিয়নের সেবক হয়ে কাজ করতে চান মো. ইদ্রিস আলী

ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশে গরিব বাড়বে ১২ লাখ : বিশ্বব্যাংক 

ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা তথা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে গরিবের তালিকায় নতুন করে যোগ হতে পারে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমতে পারে। তারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে না, এমন কথাও বলছে বিশ্বব্যাংক।

বুধবার (৮ এপ্রিল) বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সেখানে দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের গভীর দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি সংস্থাটি।

সংস্থাটির সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে|

সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দারিদ্রের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি। অর্থাৎ ২০২২ সালে যেখানে জাতীয় দারিদ্রের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি,বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, অব্যাহত থাকলে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্রের মধ্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে সংস্থাটির এ প্রতিবেদনটিতে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৫ শতাংশ, যা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে, যা দারিদ্রতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধন ঘাটতি এবং তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

একই সঙ্গে সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন করে তুলছে।

সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনৈতিক গতি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ব্যবসা পরিবেশের জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণব্যয় এবং নিয়ন্ত্রক বাধার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিও ধীর হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। যা তরুণ শ্রমবাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব খাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ব্যয় চাপের মুখে পড়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব আদায়ের কারণে বাজেট বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে, ফলে আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এ ছাড়া বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা-বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও প্রবাস আয় হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর সংস্কার, ব্যাংক খাতের দ্রুত সংস্কার এবং ব্যবসা পরিবেশ সহজীকরণ জরুরি। একই সঙ্গে নীতিগত স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, কার্যকর ও দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে প্রবৃদ্ধি আরো দুর্বল হয়ে পড়বে এবং দারিদ্রের চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে সময়োপযোগী নীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরা সম্ভব।

লেখক