মো. নাহিদুল ইসলাম ফাহিম, রাজবাড়ী :
রাজবাড়ীতে নামের বানানের পার্থক্যে ‘হাছিনা’ থেকে ‘হাসিনা’ হওয়ায় বদলে গেলো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম। সম্প্রতি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল ইউনিয়নের পাচ ‘পাঁচবাড়ীয়া হাসিনা ওয়াজেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়লয়টির নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে ‘পাঁচবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বামীর নামের সাথে মিল থাকার কারণেই এ বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করা হয় বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বিদ্যালয়টির নামের হাসিনা বা ওয়াজেদ কেউই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের কেউই নন। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন পাংশার শিক্ষা কর্মকর্তা মনিবুর রহমানের মা ‘হাছিনা ওয়াজেদ’ ও বাবা ‘ওয়াজেদ আলী মিয়ার নামেই মূলত এই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়েছিল।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১০ জুলাই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সময় গেজেট বইতে ‘হাছিনা’ বানানের পরিবর্তে ‘হাসিনা’ হয়ে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনা শুরু হয়। তবে এ ব্যাপারে কোনো প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে এ প্রজ্ঞাপনে হাসিনা ওয়াজেদ এর পরিবর্তে বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয় পাঁচবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে।
ঘটনায় বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও জমিদাতাসহ স্থানীয়রা প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের নামে স্কুলের নামকরণের দাবি জানিয়েছেন। তৎকালীন শিক্ষা কর্মকর্তা মনিবুর রহমান তার মা-বাবা অর্থাৎ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন নাম (পাঁচবাড়ীয়া হাছিনা ওয়াজেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) পুনর্বহালের দাবিতে প্রধান উপদেষ্ঠা, প্রাথমিক শিক্ষা উপদেষ্ঠা, সচিবসহ সংশিষ্ট দপ্তরের লিখিত আবেদন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল ইউনিয়নের পাঁচবাড়ীয়ায় ৩৩ শতক জমির উপর স্থানীয়দের চাহিদার প্রেক্ষিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পাংশার তৎকালীন শিক্ষা কর্মকর্তা মনিবুর রহমানের মা ‘হাছিনা ওয়াজেদ’ ও বাবা ‘ওয়াজেদ আলী মিঞা’র নামে ‘পাঁচবাড়ীয়া হাছিনা ওয়াজেদ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন স্থানীয় ৪ জমিদাতা পরিবার থেকে ৪ জন স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এখনো কর্মরত আছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলফাজ উদ্দিন। আট মাস পর তিনিও অবসরে যাবেন বলে জানা গেছে।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামের সঙ্গে মিল থাকা দেশের ৮০৮টি প্রতিষ্ঠান এবং স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের চাহিদা মোতাবেক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন নাম নির্বাচন করে রেজুলেশন পাঠায়। পরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে পাঁচবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামকরণ করা হয়।
স্কুলের সাবেক সভাপতি সৈলনাথ বিশ্বাস জানান, প্রতিষ্ঠাকালে আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্কুলের উন্নয়নের জন্য পাংশার তৎকালীন শিক্ষা অফিসার মনিবুর রহমানের মা হাছিনা ও বাবা ওয়াজেদের নামে পাঁচবাড়ীয়া হাছিনা ওয়াজেদ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামকরণ করি। ২০১৩ সালে জাতীয়করণের সময় হাছিনার স্থলে হাসিনা ওয়াজেদ হয়ে যায়। এরপর ছাত্র আন্দোলনের পর একবারে হাসিনা ওয়াজেদ বাদ দিয়ে স্কুলের নতুন নাম হয়।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলফাজ উদ্দিন জানান, ২০১৩ সালে যখন স্কুল জাতীয়করণ হয়, তখন বানানের পার্থক্য হয়। গেজেট বইতে হাছিনা বানানের স্থানে আসে হাসিনা। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর উপজেলা অফিসের নির্দেশে স্কুলের নতুন নামকরণ করা হয়েছে। স্কুলের নাম পাঁচবাড়ীয়া হাসিনা ওয়াজেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়ায় অনেকে ভেবেছে এটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা তার পরিবারের নামে। কিন্তু না, এটা আমাদের সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিবুর রহমানের মা-বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলে এবং ওই নামেই আমরা ভালো ছিলাম।
সাবেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিবুর রহমান মিয়া জানান, ২০১৩ সালে জাতীয়করণের আগ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ব্যবহার হলেও জাতীয়করণের সময় গেজেটে হাছিনা নামের বানানে হাসিনা চলে আসে। কিন্তু এই বিদ্যালয় শেখ পরিবার বা শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ মিয়ার নাম না। এটা আমার মা ও বাবার নামে। ৫ আগস্টের পর হয়তো শেখ পরিবারের নাম মনে করে আমার মা-বাবার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে আমরা ব্যথিত হয়েছি। তাই প্রতিষ্ঠাকালীন নাম পুনর্বহালের জন্য আমি এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্ঠা, প্রাথমিক শিক্ষা উপদেষ্ঠা ও সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি দিয়েছি। আশা করছি সঠিক তথ্য যাচাই করে প্রতিষ্ঠাকালীন নাম বহাল করা হবে।
রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়েলয়টির পূর্বের নাম বহাল রাখার দাবিতে সচিব বরাবর একটি আবেদন করেছেন তারা। এর অনুলিপি আমাকেও দেওয়া হয়েছে। এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অপেক্ষায় রয়েছি। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।