মোস্তফা কামাল মামুন, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ
উত্তরের দরিদ্র পীড়িত জেলা কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থল বন্দরে কাজকর্মে স্থবিরতা বিরাজ করায় নিদারুন দুঃখ-কষ্টের দিনাতিপাত করছে প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক শ্রমিক।
বাচ্চু হোটেলে এখন আর আগের মত কাস্টমার মেলেনা, মফিজা-বাচ্চু দম্পতি চালাতন এই হোটেলটি, এখানে পাথর শ্রমিকেরা পাথর ভাঙ্গা, গাড়ি লোড-আনলোড করা প্রভৃতি কাজে সারাদিন ব্যস্ত থাকলে সেখানে খাওয়া-দাওয়া করত। ব্যবসায়ীদের পূর্বের এলসি কৃত পাথরের আমদানি কিছুটা থাকলেও লোড আনলোড এবং পাথর ভাঙ্গার কাজ একেবারেই স্থবির হয়ে যাওয়ায় স্থল বন্দরের কাগজে কলমে প্রায় ১৯০০ হলেও প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৫ সহস্রাধিক এরও অধিক শ্রমিক এক প্রকার বেকার হয়ে নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করছে। যাদের ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, দিন গেলে এই টাকা দিয়ে সংসার খরচ চালান তারা, এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন , সংসার চালানোও দায় হয়ে পড়েছে। কারণ প্রায় তিন মাসের অধিক সময় থেকে স্থলবন্দরে পুরনো এলসির কিছু পাথর আমদানি করলেও নতুন করে এসে পাথর ভাঙ্গা ও লোড আনলোড কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিকের সাথে কথা হলে তারা বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ, অধিকাংশ শ্রমিকই কাজ পাচ্ছে না, পাথর ভাঙ্গা প্রায় মাসখানেক থেকে বন্ধ, স্থল বন্দরে নিয়মিত কাজ করা স্থল বন্দরের কাঁচা বাজার সংলগ্ন শ্রমিক মোঃ আয়নাল হোসেন, আজিজুল, আমিন, মকবুল ও অন্যরা জানান, আমরা দিনমজুরি করি, এর উপরে আমাদের সংসার চলে, প্রায় দেড় মাসের অধিক হল আমাদের ঘরের চুলা কোন সন্ধ্যায় জলে কোন সন্ধ্যায় জলে না। কারণ আমদানি রপ্তানি প্রায় বন্ধের সাথে সাথে পাথর ভাঙ্গাও একপ্রকার বন্ধ। ফলে পাথর ভাঙতে যে শ্রমিক লাগে ও গাড়ি লোড করতে শ্রমিক লাগে তার অধিকাংশই এখন বেকার হয়ে জীবন যাপন করছে।
মামা ভাগ্নে ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী মোঃ জামিনুল ইসলাম জানান এখন মাল আগের মত আমদানি হচ্ছে না কারণ আমদানি রেট ও ভাঙ্গার পর টোটাল যে কস্টিং পড়ে সে তুলনায় বিক্রির রেট বাংলাদেশিরা কম বলছে, লস করে তো আর ব্যবসা করা যায় না । তিনি আরো যোগ করে বলেন আমদানি ও পাথরভাঙ্গা সব সহ যে টাকা খরচ হয় মন্দার কারণে কাস্টমাররা আমাদের কাছে সেই টাকারও বেশি দিতে চাচ্ছে না।
স্থল বন্দরের আরেক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম জাক্কু জানান, পাথরের রেট কিছুটা আমদানিতে কম পড়লেও ভাঙ্গাসহ প্রায় সিএফটি প্রতি ১৫০ টাকার মত পড়ে যায়, আর বৈশ্বিক মন্দার সাথে বাংলাদেশেও তা চলমান থাকায় আমাদের দেশীয় কাস্টমাররা এই দামে কিনতে চাচ্ছে না ফলে আমদানি হলেও আমাদের দেশে সরবরাহ একপ্রকার বন্ধই বলা চলে। সে কারণে পাথর ক্রাশিং মেশিন গুলো প্রায় বন্ধের মত পড়ে আছে।
শ্রমিকদের দৈন্য দশার কথা জানতে চাইলে স্থল বন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ হামিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল বাতেন জানান, খাতায়-কলমে না থাকলেও প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক শ্রমিক দীর্ঘ কয়েক মাস যাবত কর্মহীন হয়ে নিদারুণ কষ্টে আছে, ওরা দিন আনে দিন খায়, কাজ বন্ধ থাকলে তাদের অবস্থা কি হয় এটা আপনারা কম বেশি বুঝতে পারেন। ব্যবসায়ীরা কোন কারণে হয়তো ক্রাশিং মেশিন গুলো বন্ধ করায় আমাদের শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছে তাদের অবস্থা এতটাই করুন যে খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করছে। যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তারা কিছু কিছু মাল নিয়ে এসে অল্প কিছু শ্রমিক দিয়ে ভাঙ্গলেও সেখানে বিক্রির ক্ষেত্রেও তারা লাভ না করেই ছেড়ে দিচ্ছে। হলে প্রায় সকল শ্রমিক একপ্রকার বেকার হয়ে পড়েছে।
তবে কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, বড় ব্যবসায়ীদের কোন কারসাজির কারণে হয়তো এমনটা হচ্ছে, আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আমাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় নিজেদের পুঁজি ভেঙ্গে ভেঙ্গে খেয়ে ফেলছি, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারব কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে আমদানি রপ্তানি কারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক জানান, বিশ্বের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন দেশের ডলারের রেট বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশেও বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা ক্ষেত্রে কিছুটা মন্দা ভাব বিরাজ করছে, ব্যবসায়ীদের সমস্যা হচ্ছে আশা করি অচিরেই তা কেটে যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনারহাট স্থল বন্দরের আমদানি রপ্তানি কারক সমিতির সভাপতি আবু তাহের বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আমাদের আমদানির ক্ষেত্রে ভারত থেকে গাড়ি লোডের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া, ৪০-৫০ টনের বিপরীতে ১৮-২০ টন দেয়া, গাড়ি চেকিংয়ে দীর্ঘ সূত্রীতা- সব মিলিয়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে একটা স্থিতিবস্থা বিরাজ করছে প্রায় তিন চার মাস থেকে, তবে আলোচনা চলছে, তারা আশ্বাস দিয়েছে আমাদেরকে যে, হয়তো একটা সেটআপ হয়ে গেলে এরপর আবারো স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হবে এমনটা আশা।