মেনহাজুল ইসলাম তারেক, জেলা প্রতিনিধি:
সাধারণত প্রেমের টানে বহিঃর্বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ছেলের জন্য মেয়ে কিংবা মেয়ের জন্য ছেলেদের দেশ-বিদেশে গমন সচারাচর দেখা মিললেও এবারে ঘটেছে ব্যতিক্রমী এক ঘটনা। ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বন্ধুর সাথে দেখা করতে বাংলাদেশে এসেছেন এক যুবক। ভিনদেশী যুবককে এক নজর দেখার জন্য ভীড় করছেন স্থানীয়রা। ঘটনাটি ঘটেছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়। জানা গেছে, উপজেলার পৌর শহরের রোস্তমনগর মহল্লার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের ছেলে আপন ইসলাম (১৮)। এ বছরের (২০২৫) এসএসসি পরীক্ষার্থী, আপন ইসলামের সাথে বছর দেড়ে আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয় হয় লুইস সিংজন ইয়ের নামের এক ভিনদেশী নাগরিকের। তিনি তাইওয়ানের খি লং শহরের বাসিন্দা ইয়ে লং হুয় এর ছেলে। পরিচয়ের পর থেকেই যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক দিন দিন আরও গভীর হতে থাকে। একমাস আগে লুইস হঠাৎ বাংলাদেশে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আমন্ত্রন জানান আপন ইসলাম। বন্ধুর আমন্ত্রনে ৩ হাজার ১০৮ কিলোমিটার আকাশ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় আসেন লুইস। স্থানীয়রা ছাড়াও পারিবারের সদস্যরা তাকে সাদরে বরণ করে নেন। তার আগমনে খুশি সবাই। ছেলের বন্ধু লুইসকে নিজের সন্তানের মত পরম মমতায় বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন আপনের মা-বাবা। বিদেশী লুইসকে দেখতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীড় করছেন স্থানীয়রা ছাড়াও বহিরাগত মানুষজন। তবে মানুষের এ আগমনকে আনন্দ হিসেবেই দেখছেন পরিবারের সদস্যরা। তাই ভিনদেশী মেহমানকে তার প্রিয় খাবার রান্না করে খাওয়ানোর মাধ্যমে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি দেশের কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরার কথাও জানিয়েছেন আপনের পরিবার। প্রথম বারের মত পার্বতীপুর উপজেলায় ভিনদেশী নাগরিকের আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে আসতে শুরু করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ভিন দেশীর মুখে আধো আধো বাংলা শুনে আনন্দিত তারাও। লুইসকে কাছে পেয়ে আগতদের মধ্য থেকে অনেকেই গল্প আড্ডায় মেতে ওঠেন। আবার বিশেষ মূহুর্তগুলোকে স্মৃতি হিসেবে স্মরণে রাখতে মুঠোফোনে ছবি তুলতেও অনেককে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়। তবে, এতসব কর্মকান্ডকে আনন্দের খোরাক হিসেবেই নিচ্ছেন লুইস। ভিনদেশী নাগরিক লুইসের বন্ধু আপন ইসলাম বলেন, ফেসবুকে ফুটবল খেলার ভিডিও পোষ্ট করেন তিনি। সেখানে একটি কমেন্ট থেকে তাদের পরিচয় হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি মূলত: একজন ফুটবল খেলোয়াড় আপন। পরিচয়ের পর থেকে তাদের বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সু-দৃঢ় হয়। সর্বশেষ বন্ধুত্বের টানে আমার সাথে দেখা করতে আসে সে। তার আগমনে আমি উচ্ছ্বসিত। লুইসের মাতৃভাষা চাইনিজ। তাই মনের ভাব প্রকাশে লুইস ব্যবহার করছেন সে ভাষাই। তবে, স্থানীয়দের সুবিধার্থে বন্ধু আপনকে তা বুঝিয়ে দিতে দেখা যায়। আপনের মা মিনু বেগম জানান, ছেলের বন্ধু লুইস আমারও সন্তানের মত। সে আসার পর থেকেই তার প্রিয় বিভিন্ন খাবার তৈরী করে দিয়েছি। রং চা এর পাশাপাশি নুডুলস খেতে পছন্দ করে সে। আপনের বাবা নজরুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলের সাথে দেখা করতে আসা লুইস একজন ভ্রমন প্রিয় মানুষ। আসার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা দু’জনই। প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন আসছে। তারাও অনেক আনন্দ পাচ্ছে।তাইওয়ানের নাগরিক লুইস সিংজন ইয়ে বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করেন। আপনের মামা রেজাউল শেখ শুভ বলেন, বন্ধুত্বের টানে বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই আসে শুনেছি। তবে, এবার আমাদের পার্বতীপুর প্রথমবারের মতো এ ঘটনার স্বাক্ষী হলো, এজন্য আমরা খুবই আনন্দিত! লুইসের আগমনের খবর শুনে তাকে দেখতে আসা মামুন সহ অনেকে জানান, আমরা তার ভাষা বুঝতে পারছি না। তবে, সে কয়েকটি বাংলা ভাষা রপ্ত করেছে। যার জন্য আমরা এখন কিছু কিছু বুঝতে পারি। তবে, আপন তা ট্রান্সলেট করে আমাদের বুঝিয়ে দেয়। বাংলাদেশের প্রতি লুইসের ভালোবাসায় মুগ্ধ আমরা। বন্ধুত্বের সম্পর্কের কাছে দূরত্ব কখনো বাঁধা হতে পারে না, লুইস সেটাই প্রমাণ করেছেন। তারা আরও বলেন, সুন্দর পৃথিবীর বর্তমান সমাজে স্বার্থের কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে ভেঙ্গে না যাক তাদের সম্পর্ক; লুইস-আপনের বন্ধুত্বের মতই সুন্দর হোক আমাদের সমাজের প্রতিটি সম্পর্ক, এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।