দেশের বিভিন্ন বাজারে মৌসুমের সঠিক সময়ের আগেই দেখা মিলছে বিভিন্ন জাতের লিচুর| এসব লিচুর বেশিরভাগই আধা পাকা| আর যেগুলোও পাকা রয়েছে, সময়ের আগেই সেগুলোর পেকে যাওয়ার পেছনের কারণ বা প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে নানা সমালোচনা|
অভিজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত দাম পেতে কার্বাইডসহ বিভিন্ন কেমিকেল ব্যবহার করে স্বাভাবিক সময়ের আগেই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে এসব ফল|
সাধারণত বাংলা বছরের জৈষ্ঠ্য মাসকে বলা হয় মধুমাস| কারণ, এমাসেই পাওয়া যায় দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের মৌসুমী ফল বা গ্রীষ্মকালীন ফলগুলো| তবে মৌসুমের শুরুর দিকেই বাজারজাত করে ফলের অধিক দাম পাওয়ার লক্ষ্যে গাছ ও ফলন পরিচর্যা সময় থেকেই বিভিন্ন ধরনের কেমিকেল মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে ব্যবহার করে স্বাভাবিক সময়ের আগেই ফল বাজারজাত করছেন বিভিন্ন চাষী ও ব্যবসায়ীরা| যা খাবার হিসেবে গ্রহণ করা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক হুমকি স্বরূপ|
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে রাজবাড়ী জেলা শহরের বিভিন্ন বাজারে ঘুরে দেখা যায়, ফল বাজারের পাশাপাশি বাজারের বিভিন্ন জনবহুল পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে দেশীসহ বিভিন্ন জাতের লাল-সবুজ রঙের লিচু বিক্রি করছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা| চলতি বছরের মৌসুমে নতুন ফল হিসেবে অধিকাংশ ক্রেতার নজরই লিচুর দিকে| এমনই সুযোগে ব্যবসায়ীরা জাতভেদে দেশী ও হাইব্রীড বিভিন্ন ধরনের প্রতি ১শ লিচুর দাম হাকছেন ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত| পূর্ণ মৌসুমের লিচুর তুলনায় এসকল লিচু আকারে অনেকটা ছোট| আকারে একটু বড় হলেই প্রতি ১শ লিচুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ শতাধিক টাকা| অনেক ক্রেতাই শিশুদের আবদার মেটাতে এসব লিচু কিনছেন| অনেকেই দামাদামি করে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন উপযুক্ত সামর্থের অভাবে|
ক্রেতারা বলছেন, এসব লিচুতে স্বাভাবিক পক্কতার স্বাদ না থাকলেও, তা চড়া দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা|
শিশু সন্তানের আবদারে জেলা শহরের রেলগেট এলাকায় লিচু কিনতে এসেছেন কসমেটিকস ব্যবসায়ী আকাশ হোসাইন| তিনি বলেন, “ ছেলের আবদারে এসেছি লিচু কিনতে| বিগত বছরে স্বাভাবিক সময়ে লিচু কিনেছি আকারভেদে প্রতি ১শ সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়| অথচ এখন একই সাইজের লিচুর দাম নিচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা|”
জেলা সদরের মহিষবাথান এলাকার বাসিন্দা মোশাররফ মিয়া বলেন, “ আমার বাড়িতে চায়না-থ্রি, বোম্বাই ও মোজাফফরী জাতের বেশ কয়েকটি লিচু গাছ রয়েছে| তবে গাছে কোনো প্রকার কেমিকেল প্রয়োগ না করায় সেগুলো এখনো বাজারজাত করার বা খাওয়ার উপযোগী হয়নি| আমি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করি না| শখের বসেই বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ রোপন করি|”
এদিকে বিক্রেতারা বলেছেন, বাগান থেকে বেশি দামে পাইকারি কেনায় বেশি দামেই খুচরা বিক্রি করছেন তারা|
অন্যদিকে প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক লিচু চাষী জানান, প্রথমত লিচুতে স্বাদ আসতে শুরু করলেই বিভিন্ন পাখিসহ বিভিন্ন ধরনের জন্তু লিচু নষ্ট করে ফেলে| জাল দিয়ে ঘিরে বা উপায় অবলম্বন করেও এসব নষ্ট হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না| তাই অপরিপক্ক অবস্থাতেই লিচু বাজারজাত করতে বাধ্য হই| এছাড়াও এসময় বাজারজাত করায় পূর্ণ মৌসুমের তুলনায় অনেক ভালো দামও পাওয়া যায়|
তবে সঠিক সময়ের আগেই হাইব্রীড জাতের লিচুগুলো পেকে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কেমিকেল ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন এসকল চাষীরা|
বাজারের খুচরা লিচু বিক্রেতা মো. জুয়েল বলছেন, তারা আগে থেকেই বাগান কিনে রেখেছেন, তবে বাগান মালিকদের পুরো টাকা পরিশোধ করেননি| মালিকদের পাওনা পরিশোধের চিন্তা এবং ঝড়বৃষ্টি হলে লিচুর ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তারা আগে ভাগেই লিচু বিক্রি করছেন|
মাগুরা সরকারী মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক (জীববিজ্ঞান) আব্দুল্লাহীল হাসান বলেন, সাধারণত গ্রীষ্মকালীন হাইব্রীড জাতীয় ফলগুলো বাংলা জৈষ্ঠ্য মাসের মাঝামাঝিতে বাজারজাত হওয়ার কথা| তবে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কারণে সময়ের আগেই ফল বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে গাছে মুকুল আসার পরই সেগুলোতে পিজিআর হরমোন প্রয়োগ করে থাকেন| যার ব্যবহারের ফলে যে কোনো ধরনের ফল উপযুক্ত সময়ের পূর্বেই ম্যাচিউরড আকার লাভ করে| পরে কার্বাইড প্রয়োগের মাধ্যমে সেগুলোকে সময়ের আগেই পাকিয়ে বাজারজাত করা সম্ভব হয়| যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর|
রাজবাড়ী জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. আসিফুর রহমান বলেন, লিচুর কোনো ক্যালেন্ডার আছে কি না বিষয়টি আমার জানা নেই| অপরিপক্ক লিচু টক বা বিস্বাদ হলেও স্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ নয়| তবে পাকানোর জন্য বা মাত্রাতিরিক্ত কেমিকেল ব্যবহার করলে সেটা ক্ষতিকর| এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমরা এখনো পাই নি| কেমিকেল দিয়ে পাকানোর বিষয়টি আমরা সরেজমিনে ক্ষতিয়ে দেখবো|
এবিষয়ে রাজবাড়ী জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, সময়ের আগে বাজারজাত, লিচুর আকার ও মূল্য নিয়ে আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত লিচুর বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা নির্দেশনা আসে নি| এসকল পণের মূল্য সাধারণত বাজারের চাহিদা ও মজুদের উপর নির্ভর করে| তবে কেউ যদি এবিষয়ে অভিযোগ করেন অথবা আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্দেশনা এলে আমরা এবিষয়ে নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবো|
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডি ডি) ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় দেশী জাতের বাইরে যে-সকল লিচু বাজারে দেখা যায় সেগুলো স্বাভাবিকভাবে মে মাসের শেষ তৃতীয়াংশ থেকে শুরু করে জুন মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রাকৃতিক উপায়ে পরিপক্ক অবস্থায় বাজারজাত করার উপযুক্ত সময়|
এবিষয়ে রাজবাড়ী সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বলেন, “অপরিপক্ক কোনো ফলই খাওয়া উচিত নয়| লিচুর ক্ষেত্রে তো আরও সতর্ক থাকতে হবে, লিচু একটি সেনসিটিভ ফল| অপরিপক্ক লিচু বা যেকোনো উপযুক্ত সময়ের আগেই পাকিয়ে বাজারজাত করতে কার্বাইড বা পিজিআর হরমোনের মতো যেসকল কেমিকেল ব্যবহার করা হয়| তা স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর| এসব ফল খাওয়ার ফলে যেকোনো মানুষের পেটে খিঁচুনি বা ব্যথা হতে পারে| বিশেষ করে শিশুদের জন্য এসব কেমিকেল জীবননাশের কারণও হতে পারে| এমনকি এতে ক্যানসারের ঝুঁকিও থাকে|”