এক সময় খরা আর পানির সংকটের কারণে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে মাছ চাষ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পুকুর বা জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বাড়ির উঠানেই বিশেষায়িত ট্যাংকে চাষ হচ্ছে কই, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের মাছ। এই উদ্যোগকে ঘিরে উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছে ‘ট্যাংক পল্লী’ নামে।
চণ্ডীপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ম্যাড়েয়া গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বাড়ির আঙিনায় সারিবদ্ধ বড় বড় গোলাকার ট্যাংক। দূর থেকে এগুলো পানির সংরক্ষণাগার মনে হলেও বাস্তবে এগুলো আধুনিক মাছের খামার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী-পুরুষ, তরুণ উদ্যোক্তা ও খামারকর্মীদের ব্যস্ততা ঘিরে থাকে এসব ট্যাংক।
তুলনামূলক কম পানিতে অধিক মাছ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষায়িত এ পদ্ধতিতে পানি ফিল্টার ও যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বারবার ব্যবহার করা হয়। ফলে তুলনামূলক কম পানিতে অধিক মাছ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। যেসব এলাকায় সারা বছর পর্যাপ্ত পানি থাকে না বা পুকুর নেই, সেখানেও সফলভাবে মাছ চাষ করা যাচ্ছে।
উপজেলার চণ্ডীপুর, মন্মথপুর, হাবড়া, মোমিনপুর ও পলাশবাড়ী ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রামের ৯৬টি ট্যাংকে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এসব গ্রাম এখন ‘ট্যাংক পল্লী’ হিসেবেই পরিচিত। অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে এই ট্যাংকভিত্তিক মাছ চাষ।
অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে এই ট্যাংকভিত্তিক মাছ চাষ ।
পশ্চিম ম্যাড়েয়া গ্রামের উদ্যোক্তা জিয়াউর রহমান জিয়া কয়েক বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেন। এখন তাঁর বাড়ির উঠানের ট্যাংকে নিয়মিত কই, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়া উৎপাদিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “বাড়ির উঠানেই যে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা সম্ভব, আগে তা ভাবিনি। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী মাছ বিক্রি করছি, আবার পরিবারের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হচ্ছে।”
নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যেও এ উদ্যোগ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মোমিনপুর ইউনিয়নের হয়বৎপুর গ্রামের খাদিজা বেগম তাঁর ‘খাদিজা ফিশ ফার্ম’-এ ২০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংকে প্রায় পাঁচ হাজার পোনা ছাড়েন। প্রতি উৎপাদন চক্রে প্রায় ২৫০ কেজি মাছ পাওয়া যায়। বাজারমূল্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা হলেও উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়ে তাঁর হাতে থাকে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। বছরে দুই থেকে তিনবার মাছ উৎপাদনের সুযোগ থাকায় আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ পদ্ধতিতে প্রতি উৎপাদন চক্রে প্রায় ২৫০ কেজি মাছ পাওয়া যায়।
খাদিজা বেগম বলেন, “তিন থেকে চার মাসেই মাছ বিক্রির উপযোগী হয়। প্রতি কেজি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করি। এখন আশপাশের অনেক নারী এসে খামার দেখে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, ৩০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংকে পাঁচ থেকে সাত হাজার পর্যন্ত মাছ চাষ করা যায়। বিশেষ করে ভিয়েতনামি কই, শিং, মাগুর ও তেলাপিয়া চাষে ভালো ফল মিলছে। পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে থাকায় মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং রোগবালাই ও মৃত্যুহারও কমে।
গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহেদুল হক বলেন, “প্রচলিত পুকুরভিত্তিক মাছ চাষের তুলনায় এ পদ্ধতিতে উৎপাদন বেশি এবং খাদ্য ব্যয় তুলনামূলক কম। ফলে খামারিরা স্বল্প সময়ে ভালো লাভ করতে পারছেন।”
এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ট্যাংক নির্মাণ, পোনা উৎপাদন, মাছের খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক শিক্ষিত তরুণও মাছ চাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
প্রচলিত পুকুরভিত্তিক মাছ চাষের তুলনায় এ পদ্ধতিতে উৎপাদন বেশি ও ব্যয় তুলনামূলক কম।
তবে এ প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ট্যাংক স্থাপন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনতে শুরুতেই তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে পানি পরিশোধন ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পার্বতীপুর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. খালেদ মোশারফ বলেন, “যেসব এলাকায় পুকুর নেই বা পানির সংকট রয়েছে, সেখানে ট্যাংকভিত্তিক মাছ চাষ একটি কার্যকর বিকল্প। এতে পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং নিরাপদ মাছ উৎপাদন সম্ভব।”
জিবিকে ও পিকেএসএফের সহায়তা পার্বতীপুরে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র (জিবিকে) ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রতিষ্ঠান দুটি খামারিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে। ট্যাংক স্থাপন, মাছের পরিচর্যা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ফলে নতুন উদ্যোক্তা, নারী ও যুবকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
পিকেএসএফের ম্যানেজার ফরহাদুজ্জামান বলেন, “বিশেষায়িত ট্যাংকে মাছ চাষ প্রযুক্তি খরাপ্রবণ অঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজন, আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই মৎস্য উৎপাদনের একটি কার্যকর ও সম্প্রসারণযোগ্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
এটি অনেক পরিবারের আয়, পুষ্টি ও আত্মনির্ভরতার নতুন ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, পিকেএসএফের সহায়তায় গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ কাড়ছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন গ্রামে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
খরা ও পানির সংকটের জনপদ পার্বতীপুরে বাড়ির উঠানের ট্যাংক আজ শুধু মাছ উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি অনেক পরিবারের আয়, পুষ্টি ও আত্মনির্ভরতার নতুন ভিত্তি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য খরাপ্রবণ এলাকাতেও অনুসরণযোগ্য একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।