একজন নাগরিক যখন ন্যায্য সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, একজন যোগ্য মানুষ যখন অনিয়মের কারণে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, কিংবা জনগণের অর্থে নির্মিত কোনো প্রকল্প যখন নিম্নমানের হয়—তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র।
দুর্নীতি অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা নষ্ট করে। তাই দুর্নীতিকে শুধু প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে সামাজিক সমস্যা হিসেবেও মোকাবিলা করতে হবে।
দেশে দুর্নীতি দমনের জন্য আইন, প্রতিষ্ঠান ও নানা উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু শুধু অভিযান বা শাস্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি কমানো কঠিন। কারণ দুর্নীতির একটি বড় শক্তি হলো—আমাদের নীরবতা ও আপসের মানসিকতা।
‘কাজটা দ্রুত করতে হলে কিছু টাকা দিতেই হবে’, ‘সবাই তো নেয়’, ‘আমি একা প্রতিবাদ করে কী করব’—এই মানসিকতাগুলোই দুর্নীতিকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক করে তোলে।
এখানেই প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ।
প্রতিটি নাগরিক নিজের জায়গা থেকে কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ঘুষ দিতে অস্বীকার করা, সরকারি সেবার রসিদ চাওয়া, উন্নয়নকাজে অনিয়ম দেখলে প্রশ্ন করা, প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া এবং প্রমাণ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা—এসবই নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
একই সঙ্গে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই সততা, নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্বের চর্চা বাড়াতে হবে।
তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ মানে কারও বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো, অপমান করা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। অভিযোগের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণ, ন্যায়বিচার ও আইনি প্রক্রিয়াকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি শুরু হতে পারে আমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই।
আমি ঘুষ দেব না। অন্যায় সুবিধা নেব না। অনিয়ম দেখলে নীরব থাকব না। সৎ মানুষকে নিরুৎসাহিত না করে তার পাশে দাঁড়াব—এই ছোট ছোট অঙ্গীকারই একসময় বড় সামাজিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সুশাসন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার পাশাপাশি নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে।
দুর্নীতিকে ভাগ্য বা নিয়ম হিসেবে মেনে না নিয়ে আসুন, আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। পরিবর্তন শুরু হোক আমাদের নিজেদের থেকেই।
লেখক: শোয়েব হোসেন
শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী, সংগঠক ও সমাজ গবেষক