নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজবাড়ীতে বাবার জমি ভাগাভাগি ও ভোগদখলের জেরে এক ভাইয়ের পরিবারের ৪ জনের উপর স্বসস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে অন্য ভাইদের বিরুদ্ধে। বাবার লিখে দেওয়া অংশীদার সূত্রে পাওয়া জমি নিয়ে দ্বন্দের জেরেই এমন ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাজবাড়ী জেলা সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের ইন্দ্রনারায়ণপুর গ্রামের এ ঘটনায় একই পরিবারের ৪ জন সদস্য গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীর স্বজনেরা।
এ ঘটনায় আহতরা হলেন, ইন্দ্রনারায়ণপুর এলাকার অজুল্লাহ মিয়ার ছেলে খোকন মিয়া। খোকন মিয়ার স্ত্রী আসমা বেগম (৪২) , ছেলে মামুন মিয়া (২৫) ও মেয়ে খুকি খাতুন (২৮)। আহত খুকি খাতুন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে দেখা যায়, হাসপাতালের পুরুষ সার্জারী ওয়ার্ডে গুরুতর জখম নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মামুন মিয়া। তার মাথায়, পিঠে ও পায়ে রয়েছে গুরুতর জখম। ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের দাগ। একই ভবনের মহিলা সার্জারী ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে আহত আসমা বেগম। তার পিঠে রয়েছে বেশ কিছু আঘাতের দাগ। ওই ভবনের গাইনী বিভাগে চিকিৎসাধীন আহত ও ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা খুকি খাতুন। তার কোমড়ে আঘাত করায় পেটের বাচ্চার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। পরে চিকিৎসক তাকে ভর্তি রাখেন।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) ভোর সোয়া ৫ টার দিকে কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন আলাদিপুরে অবস্থিত রাজবাড়ী জুট মিল শ্রমিক মামুন মিয়া। বাড়ি থেকে বের হয়েই রাস্তার উঠার আগে বাগানের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ অতর্কিত হামলা চালায় তার চাচাদের পরিবার। এসময় তাদের হাতে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র ছিল।
হঠাৎ করে তারা ‘ জমি নেওয়ার কত শখ, জমি নে এবার ‘ বলেই কাঠ-বাশ ও রড দিয়ে এলোপাথাড়ি পেটাতে শুরু করে। পরে এক পর্যায়ে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মাথার বিভিন্ন অংশে, পিঠে, হাতে ও পায়ের বিভিন্ন জায়গায় জখম করা হয়। এসময় মামুনের হাক-ডাকের আওয়াজ শুনে তার পরিবারের মানুষ ছুটে এসে দেখে ধারালো অস্ত্র মামুনের গলায় ধরা রয়েছে। মামুন লুটিয়ে পরে রয়েছে মাটিতে। তাকে উদ্ধার করতে গেলে একে এক মামুনের বাবা খোকন, মা আসমা বেগম ও ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বোন খুকিকেও এলোপাথাড়ি পুটিয়ে জখম করা হয়।
পরে মামুনকে একটি গাছের সাথে বেধে রেখে আবার পেটানো হয়। শেষে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের মোবাইল টিম খবর পেয়ে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের পুরুষ সার্জারী ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আহত মামুন মিয়া বলেন, আমি আমার কর্মস্থল মিলে যাচ্ছিলাম সকাল সাড়ে ৫ টার দিকে। এমন সময়ে হঠাৎ করেই আমার চাচারা আমার পথ আটকে আমাকে এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে। আমি চিৎকার করলে আমার বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে এলে আমার বাবা-মা ও বোনকেও তারা এলোপাতাড়ি মারধর করে জখম করে। পরে আমাকে বেধে রেখে আবারও পেটায়। পরে পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার করে।
হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আহত খুকি খাতুন বলেন, আমার ভাইকে কাজে যাওয়ার সময়ে একা পেয়ে সসস্ত্র হামলা করে আমার চাচারা। এক পর্যায়ে তার চিৎকারের আওয়াজ শুনে আমরা দৌড়ে গেলে আমার বাবা-মাকেসহ আমাকেও এলোপাতাড়ি পেটায়। আমি ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। যে কারণেই আলাদা পরিচর্যার জন্য আমি বাবার বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করছি। আমার কোমড়ে আঘাতের পরে আমার পেটের বাচ্চার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে আমি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই।
আহত মামুনের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী আলাদিপুর জুট মিলে চাকরী করে। সে ভোরের শিফটে কাজে যাওয়ার সময় তার চাচারা তার উপর আক্রমণ করে। আমরা ছুটে এসে আটকাতে গেলে আমার কোলে বাচ্চা থাকায় আমি সামনে যেতে পারিনি। তবে আমার শশুর-শাশুড়ি তাদের মারধরে বাধা দিতে গেলে তারাও হামলার শিকার হন এবং গুরুতরভাবে জখম হন।
তিনি বলেন, পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে আমরা সকলকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। এসময় আমরা কেউ বাড়িতে না থাকা অবস্থায় কেউ বা কারা আমাদের বাড়িতে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে বিভিন্ন আসবাব পত্র ভাঙচুর করে। পাশাপাশি আমার শশুড়ের রুমে থাকা আলমারীর সবগুলো লকার তালা ভাঙা ও খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে বাড়ির জমি-জমা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র ছিল। এছাড়াও বাড়ির গোয়াল ঘর ও টয়লেটের দরজাও ভেঙে খুলে ফেলেন তারা৷
আহত খোকন মিয়া বলেন, আমাদের পৈত্রিক জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবত আমার অন্যান্য ভাইয়েরা আমাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছে। আমার পাশাপাশি আমার ছেলেই বিতর্কের মাধ্যমে লড়ে আসছিল।
তিনি বলেন, এর জের ধরেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে তারা ওত পেতে থেকে আমার ছেলেকে মেরে ফেলার টার্গেট নিয়েছিল। কারণ তাদের কাছে তখন ধারালো দেশীয় অস্ত্র ছিল। যা দিয়ে আমার ছেলের গলায় আঘাতের চেষ্টা করে তারা। পরে আমার স্ত্রী জবরদস্তি করে সেটাকে কেড়ে নিয়ে ফেলে দেয়। তখন তাকেও এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তারা মারধরের পর আমার ছেলেকে গাছের সাথে বেধে আমারও পেটাতে থাকে। পরে সদর থানার এস আই মিকাঈলের নেতৃত্বে পুলিশের মোবাইল টিম এসে আমাদের উদ্ধার করে। পরবর্তীতে এ ঘটনার বিচার চেয়ে আমি বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছি। আমরা এ ঘটনার সু্ষ্ঠু বিচার ও হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি প্রত্যাশা করছি।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার জিয়াউর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে এখনো আমার জানা নেই। তবে থানায় অভিযোগ যেহেতু দিয়েছে। আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।